1.4 তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারে নৈতিকতা (Ethics of ICT usages)

নৈতিকতা হচ্ছে এক ধরনের মানদন্ড যা আচরণ, কাজ এবং পছন্দের ক্ষেত্রে সহায়তা করে। এটি ঔচিত্য ও অনুচিত্যের মাপকাঠিও বটে, কেননা মানবধর্ম এবং নৈতিকতা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। অনৈতিক ও বেআইনি এক বিষয় নয়। অনেক অনৈতিক কাজ আইন বিরুদ্ধ নয়, কিন্তু সকল আইন বিরুদ্ধ কাজ অবশ্যই অনৈতিক। তবে সাম্প্রতিক কালে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে নানা ধরনের অনৈতিক এবং অন্যায় কাজের মাত্রা এত বেড়ে গেছে যে পৃথিবীর অনেক দেশেই সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কঠোর আইন প্রণয়ন করেছে। কাজেই একসময় যে কাজটি শুধু অনৈতিক ছিল সেটি অনেক ক্ষেত্রে এখন বেআইনি হয়ে গেছে, অর্থাৎ সামনাসামনি কাউকে গালাগাল করে একজন পার পেয়ে যেতে পারে, কিন্তু ফেসবুকে কাউকে গালাগাল করে একজন জেলে চলে যেতে পারে।

যেহেতু পৃথিবীর প্রায় সকল মানুষ কোনো না কোনোভাবে তথ্য প্রযুক্তির সাথে সম্পৃক্ত তাই এর ব্যবহারের নৈতিকতার বিষয়টি খুব গুরুত্ব দিয়ে নেওয়া উচিত। গুরুত্ব না দেয়া হলে একজন অনৈতিক কাজ দিয়ে শুরু করে খুব সহজেই অন্যায় এবং অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়তে পারে। তাই সকল কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্ত ব্যবহারে নৈতিকতা সম্পর্কে অবহিত এবং যথাযথভাবে রপ্ত হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

কম্পিউটার ইথিক্স ইনস্টিটিউট ১৯৯২ সালে কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিষয়ে দশটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। সেগুলো হচ্ছে :
১. তুমি কম্পিউটার ব্যবহার করে অন্যের ক্ষতি করবে না।
২. তুমি অন্যের কম্পিউটার সংক্রান্ত কাজে হস্তক্ষেপ করবে না।
৩. তুমি অন্য কারও ফাইলে নাক গলাবে না।
৪. তুমি চুরি উদ্দেশ্যে কম্পিউটার ব্যবহার করবে না।
৫. তুমি মিথ্যা তথ্যের জন্য কম্পিউটার ব্যবহার করবে না।
৬. তুমি লাইসেন্সবিহীন সফটওয়্যার ব্যবহার ও কপি করবে না।
৭. তুমি বিনা অনুমতিতে কম্পিউটার সংক্রান্ত অন্যের রিসোর্স ব্যবহার করবে না।
৮. তুমি অন্যের কাজকে নিজের কাজ বলে চালিয়ে দেবে না।
৯. তুমি তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারের আগে সমাজের উপর এর প্রভাব সম্পর্কে চিন্তা করবে।
১০. তুমি কম্পিউটার ব্যবহার করার সময় অন্যের ভালোমন্দ বিবেচনা করবে এবং শ্রদ্ধাবোধ প্রদর্শন করবে।

কম্পিউটার, ইন্টারনেট কিংবা মোবাইল ফোন ব্যবহার করার সময় যদি উপরে বর্ণিত তথ্য প্রযুক্তিগত নৈতিক নির্দেশনা গুলো সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা খুবই জরুরী।

আজকাল ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনেক ধরনের অনৈতিক এবং অপরাধমূলক কাজ সংঘটিত হয়। এর ভেতর বহুল প্রচলিত গুলো হচ্ছে :

হ্যাকিং (Hacking) : কোনো কম্পিউটার সিস্টেম, নেটওয়ার্ক, ডেটার উপর অননুমোদিতভাবে অধিকার (Access) লাভ করার উপায়কে হ্যাকিং বলে। এতে ব্যক্তির তথ্যের বা সিস্টেমের ক্ষতিসাধন করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে কোনো ক্ষতি না করে শুধু নিরাপত্তা ত্রুটি সম্পর্কে কম্পিউটার ব্যবহারকারীকে জানান দেয়া হয়। যে সব ব্যক্তি/ব্যক্তিবর্গ এ ধরনের কর্মে/অপকর্মের সাথে জড়িত থাকে তাদের হ্যাকার বলে।

ফিশিং (Phishing): ফিশিং করার অর্থ ই-মেইল বা মেসেজের মাধ্যমে ওয়েবসাইট ব্যবহারকারীকে নকল বা ফেইক ওয়েবসাইটে নিয়ে কৌশলে তার বিশ্বস্ততা অর্জন করা এবং তারপর ব্যবহারকারীর অ্যাকসেস কোড, পিন নম্বর, ক্রেডিট কার্ড নম্বর, পাসওয়ার্ড, ব্যাংক একাউন্ট নম্বরের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরি করে তাদের নানা ধরনের বিপদে ফেলা।

স্প্যামিং (Spamming): অনাকাঙ্খিত বা অবাঞ্ছিত ই-মেইল কিংবা মেসেজ পাঠানোকে স্প্যামিং বলে। এই কাজ যারা করে তাদেরকে স্প্যামার বলা হয়। যখন কোনো ব্যবহারকারী কোনো ওয়েবসাইট ভিজিট করেন বা কোনো গ্রুপের মেসেজ বোর্ডে প্রবেশ করেন তখন স্প্যামাররা সেখান থেকে ই-মেইল অ্যাড্রেস সংগ্রহ করে ব্যবহারকারীর ই-মেইলে বিভিন্ন প্রতারণা মূলক মেসেজ পাঠায়।

সফটওয়্যার পাইরেসি (Software Piracy) : সফটওয়্যার একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রযুক্তি পণ্য, যা প্রোগ্রামারগণ পেশাগত দক্ষতা, মেধা আর মননের সর্বোচ্চ প্রয়োগ ঘটিয়ে তৈরি করে থাকেন এবং এগুলোর তাঁরাই স্বত্বাধিকারী হন। লাইসেন্সবিহীন ভাবে বা স্বাত্বাধিকারীর অনুমোদন ব্যতিরেকে এ ধরনের সফটওয়্যার কপি করা, নিজের নামে কিংবা কোনো প্রকার পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে ব্যবহারের সুযোগ নেয়া পাইরেসির আওতায় পড়ে। Business Software Alliance (BSA)-এর সূত্রমতে ব্যবহৃত সকল সফটওয়্যারের প্রায় 36 ভাগই পাইরেটেড সফটওয়্যার। কপিরাইট আইন দ্বারা উন্নত দেশগুলোয় এই ধরনের অপরাধ প্রতিহত করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

প্লেজিয়ারিজম (Plagiarism) : কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কোনো লেখা, সাহিত্যকর্ম, গবেষণাপত্র, সম্পাদনা কর্ম ইত্যাদি হুবহু নকল বা আংশিক পরিবর্তন করে নিজের নামে প্রকাশ করাই হলো প্লেজিয়ারিজম। সঠিক সূত্র উল্লেখ ছাড়া কোনো কিছু রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহারও বেআইনি কাজ তথা প্লেজিয়ারিজমের আওতায় পড়ে।

সাইবার আইন : সাইবার অপরাধ দমনে বিভিন্ন দেশেই আইন চালু আছে। আমাদের দেশে ২০০৬ সালে প্রণীত ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন-২০০৬’ এর ৫৭(১) ধারামতে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করে যা মিথ্যা ও অশ্লীল, যার দ্বারা কারও মানহানি ঘটে বা ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়, আর এ ধরনের তথ্যগুলোর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে উস্কানি প্রদান করা হলে অনধিক দশ বছর কারাদন্ড এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দন্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে।’ এছাড়া, পর্ণগ্রাফি আইন-২০১২-তে বর্ণিত আছে, ‘কোনো ব্যক্তি ইন্টারনেট বা ওয়েবসাইট বা মোবাইল ফোন বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে পর্ণগ্রাফি সরবরাহ করলে সর্বোচ্চ 5 বছর সশ্রম কারা দন্ড এবং 2 লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দন্ডিত হবেন।’

সর্বশেষ 2018 সালে আমাদের দেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণীত হয়, যার আংশিক উল্লেখ করা হলো:
• কোনো ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোয় বেআইনি প্রবেশ করে ক্ষতিসাধন, বিনষ্ট বা অকার্যকরের চেষ্টা কিংবা কম্পিউটার সিস্টেম, নেটওয়ার্ক বা প্রোগ্রাম ধ্বংস/পরিবর্তন বা অকার্যকর করতে পারবেন না।
• ইলেকট্রনিক ডিভাইস, কম্পিউটার সিস্টেমে অবৈধ ভাবে প্রবেশ করতে পারবেন না, সেখান থেকে কোনো তথ্য বা উদ্ধৃতাংশ বা উপাত্তের অনুলিপি সংগ্রহ করতে পারবেন না।
• ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যম ব্যবহার করে কারো সাথে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতারণা, জালিয়াতি বা ছদ্মবেশ ধারণ করতে পারবেন না।
• ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যম ব্যবহার করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে প্রচার বা অপপ্রচার কিংবা এতে মদদ দিতে পারবেন না।
• রাষ্ট্রের অখণ্ডতা, নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় এমন বিভ্রান্তিকর তথ্য অপপ্রচার বা কার্যকলাপ, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা জাতিগত ঘৃণা-উস্কানি বা বিভেদ/বিদ্বেষ সৃষ্টি করে কিংবা সামাজিকভাবে বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয় এরূপ কোনো কার্যক্রম ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যম ব্যবহার করে করা যাবে না।
• ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যম ব্যবহার করে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি নষ্ট, অপমান বা অপদস্থ করা কিংবা ভয় ভীতি বা হুমকি প্রদর্শন করা যাবে না।
• ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে ব্যাংক, বীমা ইত্যাদি আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারি, আধা সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে অবৈধ অনুপ্রবেশ করে আর্থিক ক্ষতি বা তছরূপ কিংবা অত্যন্ত গোপনীয় তথ্য চুরি, তথ্য পাচার করা যাবে না।

ডিজিটাল আইনের আওতায় উল্লিখিত কৃত অপরাধের জন্য বিভিন্ন মেয়াদের শাস্তি এবং আর্থিক দন্ড প্রদানের বিধান রাখা হয়েছে।

তাই আমাদের জীবনের অন্যান্য প্রতিটি সেক্টরের ন্যায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিবেক, বুদ্ধি ও বিবেচনাকে নৈতিকতার মানদন্ড হিসেবে ব্যবহার করে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিসহ সবধরনের অপরাধমূলক কাজের প্রবণতা হতে পরিত্রাণ পেতে পারি।

ভিন্ন ধরনের অপরাধ


অ্যান্টি ট্রাস্ট : প্রযুক্তি মোড়লদের বিরুদ্ধে শুনানি :
আমরা যখন সাইবার ক্রাইম নিয়ে কথা বলি তখন সবসময়ই ব্যক্তিগত অপরাধ কিংবা ছোটখাটো অপরাধী সংগঠনের অপরাধ নিয়ে কথা বলি। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না যে সারা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সফটওয়্যার কোম্পানিগুলো অনেক বড় বড় অপরাধ করে শুধু দোষী সাব্যস্ত হয়নি তার জন্য শাস্তি ভোগ করেছে। ফেসবুক তার ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য ক্যামব্রিজ এনালিটিকাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে দিয়ে অনেক বড় অপরাধ করেছিল। হোয়াটসঅ্যাপ সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার জন্য তাদেরকে ১১০ মিলিয়ন ইউরো জরিমানা করা হয়েছিল। কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য ২০১৬ সালে আপেল কোম্পানিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আয়ারলান্ডকে ১৪.৫ বিলিয়ন ইউরো ফেরত দিতে। আইন ভঙ্গ করে অন্যান্য ছোট কোম্পানির অস্তিত্ব বিপন্ন করে বিশ্বাস ভঙ্গ করার জন্য গুগলকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ বিলিয়ন ইউরো জরিমানা করা হয়েছে। নিয়ম বহির্ভূত কাজের জন্য জার্মানিতে আমাজনের বিরুদ্ধে তদন্ত হচ্ছে। এরকম উদাহরণের কোনো শেষ নেই, এই বড় বড় কোম্পানিগুলোর কাছে পৃথিবীর সবচাইতে বেশি ডেটা। যারা ডেটা নিয়ন্ত্রণ করে, তারা পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করে। কাজেই একধরনের আশঙ্কা আছে যে পৃথিবীর মানুষের সচেতন না হলে পুরো পৃথিবী একসময় কয়েকটি দৈত্যাকৃতির সফটওয়্যার কোম্পানির হাতে নিয়ন্ত্রিত হবে। সেটি যেন না হতে পারে সেজন্য সবার সচেতন থাকার প্রয়োজন আছে।