1.6 তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন (ICT & Economical Development)

অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলতে একটি দেশের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নকেই বোঝায়। উন্নত জীবনযাত্রা মানে উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা, সাধারণ মানুষের আয়ের স্তর বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত হওয়া, নিরাপদ জীবন ব্যবস্থা থাকা এবং সবার উপর নাগরিকদের মৌলিক চাহিদাগুলো অনায়াসে পূরণ হওয়াকে বোঝায়। তথ্য প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতিতে নাগরিক জীবনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে উন্নয়নের ছোঁয়ায় মানুষের জীবন আরো বেগবান, সহজ, নিরাপদ এবং স্বাচ্ছন্দ্যময় হয়েছে। সেই সাথে অবাধ তথ্য প্রবাহের জন্য পুরো পৃথিবীকেই একটি গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত করে দিয়েছে।

আজকের বিশ্বে কম্পিউটার, সাবমেরিন কেবল এবং স্যাটেলাইট প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে সকল উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোই নিজেদের মতো করে তথ্য প্রবাহের মহাসড়কে প্রবেশ করে চলেছে। এর সূত্র ধরে অর্থনীতিবিদগণ বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, উন্নত দেশগুলোর তুলনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর উৎপাদন খরচ অনেক কম হওয়ায়, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আইসিটির উন্নয়নের মাধ্যমে তাদের উল্লেখযোগ্য মাত্রায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ভূমিকা
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, এদের সমৃদ্ধির পিছনে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিগত উন্নয়ন অনেক বড় ভূমিকা পালন করেছে। এই খাতে প্রচুর বিনিয়োগে বেড়েছে মূলধন এবং প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বেড়েছে বহুগুণে। ইউরোপীয় এবং উন্নত দেশগুলোয় জিডিপি-গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট বৃদ্ধির কারণ হিসেবে অর্থনীতির গবেষকগণ টেলিকমিউনিকেশন খাতের উন্নয়নকে চিহ্নিত করে থাকলেও সিঙ্গাপুর, কোরিয়ার মতো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃ্দ্ধির কারণ হিসেবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়নকেই চিহ্নিত করেছেন।

উন্নয়ন প্রক্রিয়া : গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, উন্নয়নশীল দেশগুলোয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন সংঘটনে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নিচে উল্লিখিত প্রক্রিয়ায় কাজ করে থাকে :
• শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও বেকারত্ব দূরীকরণের ক্ষেত্রে সম অধিকার নিশ্চিতকরণ।
• সহজ পদ্ধতিতে তথ্য প্রাপ্তির ব্যবস্থাকরণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সক্ষমতা সৃষ্টি।
• মানসম্মত কিন্তু তুলনামূলক ভাবে কম দামের আইসিটি দ্রব্যের সহজলভ্যতা।
• দেশের সর্বস্তরে ই-গভর্নেন্সের (ইলেকট্রনিক গর্ভর্নেন্স) চালুর মাধ্যমে সরকারি আমলাতন্ত্র হ্রাস।
• প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে বৃহৎ বাজার-সুবিধা প্রদান এবং স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে যোগাযোগ এবং সহযোগিতার মনোভাব তৈরি।
জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি:
আইসিটির উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে জন্ম নিচ্ছে নতুনতর অর্থনীতি, যার নাম জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি বা নলেজ ইকোনমি। জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি বিকাশের সাথে সাথে আমেরিকা, ইউরোপ কিংবা বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে বিপুল পরিমাণ ডেটা প্রসেসিং বা প্রক্রিয়াকরণের। যার ফলে উন্নয়নশীল দেশসমূহ আইসিটি এনাবল্ড সার্ভিসগুলোকে কাজে লাগিয়ে অর্জন করছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন নয়, এর ফলে বিপুল সংখ্যক প্রশিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।

বাংলাদেশ প্রেক্ষিত
বাংলাদেশের অর্থনীতি পৃথিবীর দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতি। বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য দেশের তুলনায় World Economic Forum-এর উন্নয়ন সূচকে আমরা 34 তম অবস্থানে রয়েছি এবং 2030 সালের মধ্যে এই অবস্থান 24 তম হবে মর্মে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশকে উন্নয়নের সূচকে পৃথিবীর ‘পরবর্তী এগারোটি’ দেশের একটি দেশ বিবেচনা করা হয়।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি দুইভাবে অর্থনীতির উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে। একটি সরাসরি সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রির (Software ITES) নানা ধরনের কর্মকান্ডের মাধ্যমে। অন্যটি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়নের কারণে নানা ধরনের সুযোগ সৃষ্টির কারণে বিভিন্ন সেবা দিয়ে অর্থনীতির উন্নয়নের মাধ্যমে। এদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকান্ডে দেশীয় মোট উৎপাদনের 8% (শতকরা আট) ভাগ প্রবৃদ্ধি আইসিটি খাতের অবদান বলে অনুমান করা হয়। অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউট-এর মতে বিশ্বের মধ্যে অনলাইন কর্মীর সংখ্যার দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি :
2019 সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে ৮০০ (আট শত) রেজিস্টার্ড সফটওয়্যার কোম্পানি রয়েছে, অনুমান করা হয় এর পাশাপাশি অ-নিবন্ধিত আরো অনেক সফটওয়্যার কোম্পানি দেশে কাজ করছে। সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোতে 30 হাজার থেকে বেশি পেশাজীবী কাজ করছেন এবং এর মোট রাজস্বের পরিমাণ 250 মিলিয়ন ডলার। 2016-17 সালে এই খাতে বাংলাদেশে আয় ছিল 800 (আট শত) মিলিয়ন ডলার এবং 2021 সালের ভেতর এটিকে এক বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ উদ্যোগ :
ডিজিটাল বাংলাদেশ বলতে দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে যথোপযুক্ত প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করণকে বোঝায়, যার মূল দায়িত্বটি পালন করতে হয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিকে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতে আমূল পরিবর্তন হয়েছে। দেশে বিদেশে টাকা পাঠানো অনেক সহজ হয়েছে। ইন্টারনেট দিয়ে নানা ধরনের বিল প্রদান করা যায়, এমনকি আয়কর পরিশোধ করা যায়। 2020 সালে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের সময় দেশে টেলিমেডিসিন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা শুরু হয়েছিল।

আমাদের দেশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জন্য একসেস টু ইনফরমেশন (a2i) প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় তথ্য অফিসের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যোগাযোগ স্থাপনের কাজ চালু হয়েছে। এতে করে তৃণমূল পর্যায়ের প্রশাসনিক ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি সরকারি সবধরনের পরিষেবার তথ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদ অফিস, সাব-পোষ্ট অফিসে তথ্য ও সেবা কেন্দ্র চালু করে সরকারি সবধরনের ডিজিটাল সার্ভিস সেবা প্রদান অব্যাহত রয়েছে।

কৃষি সেবা :
বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অংশটি কৃষি খাত থেকে আসে কাজেই কৃষি ব্যবস্থায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার অর্থনীতির উন্নয়নে একটা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। গণমাধ্যমে নানা ধরনের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কৃষকদের ফসল, কৃষিপদ্ধতি, বাজারজাতকরণ সম্পর্কে নানা ধরনের তথ্য দেওয়া হয়। দেশের সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কৃষকদের নানা ধরণের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য ওয়েবসাইট এবং অ্যাপ গড়ে তোলা হয়েছে। বাংলাদেশ এই ধরনের উদ্যোগে সুফল পেতে শুরু করেছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে কৃষিপণ্যের উৎপাদন বহুগুণে বেড়ে গেছে।

শিল্প ও উৎপাদন:
বাংলাদেশের প্রধান শিল্প গার্মেন্টস যেখানে 2018 সালে 36.67 বিলিয়ন ডলার রপ্তানি বাণিজ্য হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার করে সমগ্র বিশ্বে নতুন বাজার ধরা, রপ্তানিযোগ্য পণ্য নির্বাচন কিংবা প্রয়োজনে ক্রেতা-বিক্রেতার মাঝে আলাপ-আলোচনা সবকিছুই আজকাল তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পাদন হয়। গার্মেন্টস ছাড়াও রপ্তানি বাণিজ্যে জাহাজ নির্মাণ, মৎস্য, পাট, চামড়া শিল্প এবং ওষুধ শিল্পে বাংলাদেশ বড় ভূমিকা রেখেছে এবং এ সবগুলোর বিকাশই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বড় ভূমিকা রাখা সম্ভব।

দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থান:
এক সময়ে আশঙ্কা করা হতো তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিস্তারের কারণে অনেকের চাকুরি চলে গিয়ে বেকারত্ব বাড়বে। বাস্তবে এর সম্পূর্ণ বিপরীত ঘটনা ঘটেছে এবং যার ফলস্বরূপ লক্ষ লক্ষ বেকার যুবক-যুবতীর কর্মসংস্থান হয়েছে। সে কারণে আইসিটি প্রফেশনালদের চাহিদা দেশে-বিদেশে বেড়েই চলছে। অতীতের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে, বিশ্বে প্রায় তিন মিলিয়ন আইটি পেশাজীবীর প্রয়োজন ছিল। বর্তমানে এ সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি দাঁড়িয়েছে। যদি বিশ্ব চাহিদার প্রেক্ষিতে আমাদের দেশের প্রায় 50 হাজার আইটি প্রফেশনাল সরবরাহ করতে পারি তবে বর্তমান রেমিটেন্স বহুগুণে বাড়ানো সম্ভব। আমাদের দেশের প্রায় এক কোটি লোক বিদেশে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে এবং তাদের পাঠানো রেমিটেন্স আমাদের জিডিপি-এর প্রায় 10 শতাংশ পূরণ করে থাকে। যদি এই শ্রমিকদের তথ্য প্রযুক্তিতে ন্যূনতম প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠানো সম্ভব হয় তাহলেও তারা শুরু যে উন্নততর জীবন যাপন করতে পারবে তাই নয়, আমাদের অর্থনীতিতেও অনেক বেশি অবদান রাখতে পারবে।